ন-এ যদি নগদ হয়, ব-এ তবে কী?

তোপসে, এই নগদের বিবর্তনটা বেশ রহস্যময়। লালুপ্রসাদ যাদবের সেই বিখ্যাত সংলাপের মতো এখানেও ‘নিয়ম’ নিজের মতো চলেছে।

ন-এ যদি নগদ হয়, ব-এ তবে কী?

নগদের জন্ম ও নিয়মের খেলা

নগদ যাত্রা শুরু করে ২০১৯ সালের ২৬ মার্চ। ডাক বিভাগ আর ‘থার্ড ওয়েভ টেকনোলজি’ মিলে এটি তৈরি করে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এর উদ্বোধন করেন। নগদের জন্য এমএফএস খাতের প্রচলিত নিয়ম মানা হয়নি। এটি বাংলাদেশ ব্যাংকের বদলে ‘পোস্ট অফিস অ্যাক্ট’ অনুযায়ী পরিচালিত হতো। একে বলা হয় ‘রেগুলেটরি আরবিট্রেজ’ বা নিয়মের ফাঁক-ফোকড় ব্যবহার করা। এই ফাঁক-ফোকড়ের কারণে নগদ অন্যান্য এমএফএস-এর চেয়ে বেশি লেনদেনের সুযোগ পায়। এর প্রতিষ্ঠাতাদের সাথে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও সজীব ওয়াজেদ জয়ের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। এমনকি ২০২৩ সালে শেখ হাসিনা নগদকে ‘দ্রুততম ইউনিকর্ন’ পুরস্কারও দেন।

বিশেষ খাতিরে সীমার বাইরে লেনদেন

শোনো তোপসে, নগদের এই রমরমা ব্যবসার পেছনে ছিল নিয়মের এক বিশাল ছাড়। যেখানে অন্য এমএফএস-রা দিনে মাত্র ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা লেনদেনের অনুমতি পেত। সেখানে নগদ একাই দিনে ২.৫ লক্ষ (২,৫০,০০০) টাকা লেনদেনের রাজকীয় সুযোগ পেয়েছিল। একবারে পাঠানো যেত ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত। ডাক বিভাগের আইনের দোহাই দিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কড়া নিয়ম তারা স্রেফ এড়িয়ে গিয়েছিল। দ্য ইকোনমিস্টের ভাষায়, এটি ছিল এক বিশেষ ধরনের ‘স্পেশাল ট্রিটমেন্ট’।

ব্যাংকের ব্যাকআপ ও প্রভাবশালীর খুঁটি

নিয়ম অনুযায়ী প্রতিটি এমএফএস-এর ব্যাংকের সাথে ট্রাস্ট কাম সেটেলমেন্ট অ্যাকাউন্ট (TCSA) থাকতে হয়। কিন্তু নগদ দীর্ঘদিন কোনো স্থায়ী লাইসেন্স ছাড়াই ব্যবসা করেছে। তারা কেবল ডাক বিভাগের অস্থায়ী অনুমতি নিয়ে চলত। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বারবার চিঠি দিলেও তারা নিয়ম মানেনি। এর পেছনে ছিল রাজনৈতিক প্রভাব। নগদের মালিকানায় তৎকালীন আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য নাহিম রাজ্জাক ও রাজী মোহাম্মদ ফখরুল ছিলেন। যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য নিয়াজ মোর্শেদ এলিটও এর পরিচালক ছিলেন। এই প্রভাবশালী ব্যক্তিদের কারণেই বাংলাদেশ ব্যাংক বা ডাক বিভাগ কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।

পতন ও আগামীর ভবিষ্যৎ

৫ আগস্টের পর নগদের শীর্ষ কর্মকর্তারা অফিস আসা বন্ধ করে দেন। সাবেক সিইও তানভীর আহমেদসহ অনেকে দেশ ছাড়েন। এরপর কেন্দ্রীয় ব্যাংক ২১ আগস্ট সেখানে প্রশাসক নিয়োগ দেয়। তদন্তে দেখা গেছে, নগদে প্রায় ২৩.৫৬ বিলিয়ন টাকার গরমিল রয়েছে। এর মধ্যে ৬.৪৫ বিলিয়ন টাকার কোনো নগদ জোগান ছাড়াই ‘ই-মানি’ তৈরি করা হয়েছিল। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটিকে পুনর্গঠন করার চেষ্টা চলছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, গ্রাহকের আমানত রক্ষা করতে এটিকে একটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের অধীনে নিয়ে যাওয়া হতে পারে। অর্থাৎ, পুরোনো মালিকদের বদলে এটি এখন সরকারি নিয়ন্ত্রণে চলবে।

আরমানের মধ্যস্থতা ও বিদেশি বিনিয়োগের রহস্য

জামায়াতের সাবেক নেতা মীর কাসেম আলীর ছেলে মীর আহমদ বিন কাসেম (আরমান) সম্প্রতি আলোচনায় এসেছেন। তিনি নগদে বিদেশি বিনিয়োগ নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সাথে বৈঠক করেছেন। বর্তমানে নগদে ৯ জন পরিচালক আছেন যারা দেশি-বিদেশি বিভিন্ন কোম্পানির প্রতিনিধি। বিদেশি বিনিয়োগ এলে প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সংকট কাটতে পারে। তবে তার ব্যক্তিগত স্বার্থ কী, তা স্পষ্টভাবে জানা নেই। তিনি মূলত বিদেশি বিনিয়োগকারীদের পক্ষ হয়ে মধ্যস্থতা করার চেষ্টা করছেন বলে জানা গেছে। তোপসে, এই হলো নগদের বর্তমান মগজাস্ত্রের খেলা। ডিজিটাল জালিয়াতির এই রহস্য বেশ গভীর। পরবর্তী তদন্তে হয়তো আরও অনেক কিছু বের হবে।